শিরোনামঃ
দেড় কিলোমিটার হেঁটে চাচাকে মাথায় করে হাসপাতালে নিলেন ভাতিজা আটকে পড়াদের আমিরাতে ফেরার জন্য নির্দেশিকা দিলো এমিরেটস কাতারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে নতুন সিদ্ধান্ত, কিছু বিধিনিষেধ শিথিল ঢাকা থেকে আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটে ট্রানজিট যাত্রী পরিবহনের অনুমতি ৩০ মিনিট পরীর বাসার সামনে থেকে ব্যবসায় সবুজ বাতি এমদাদের কাতারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চমৎকার: সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আটক হচ্ছেন চিত্রনায়িকা পরীমণি, বাসায় র‌্যাবের অভিযান চলছে লাইভে এসে চিৎকার করছেন পরীমনি, দরজার বাইরে পুলিশ বিয়েতে যাওয়া হলো না বরপক্ষের, নৌকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে ২০ জনের লাশ হোটেলে বমি করে ভাঙচুর চালালেন অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়রা
দুর্ঘটনায় মারা গেলেও লেখা হয় স্ট্রোক, কাতার থেকে ৫ মাসে দেশে এসেছে ১০০ প্রবাসীর লাশ

দুর্ঘটনায় মারা গেলেও লেখা হয় স্ট্রোক, কাতার থেকে ৫ মাসে দেশে এসেছে ১০০ প্রবাসীর লাশ

এক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের রিয়াদে মোহাম্মদ নুরুল আমিন নামে একজন প্রবাসী কর্মী মা’রা যান। তার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে। তার সঙ্গে থাকা অন্যান্য প্রবাসীরা জানান, রাতে খাবারের পর ঘুমিয়ে পড়লে সকালে আর ওঠেননি। তাদের ধারণা স্ট্রো’কে কিংবা হার্ট অ্যা’টাকে তার মৃ’ত্যু হয়েছে। শুধু স্ট্রো’কের কারণে মৃ’ত্যুবরণ করে ওমান থেকে লা’শ হয়ে ফিরেছেন ৪৮ বছর বয়সী আক্তার মিয়া, কুয়েত থেকে ৩৯ বছর বয়সী সুন্দর আলী, দুবাই থেকে ৩৯ বছর বয়সী রতন মিয়া, সৌদি আরব থেকে ৪৮ বছর বয়সী শাহ্ আলম, কাতার থেকে ২৯ বছর বয়সী বশির উদ্দিন, বাহরাইন থেকে ৩৫ বছর বয়সী জিয়াবুল হোসেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেসব মধ্যবয়সী কর্মীদের লা’শ আসছে তাদের বেশির ভাগের মৃ’ত্যু স্ট্রো’কে’র কারণে।

 

বিশ্বের ১৬৪ দেশে কাজ করেন প্রবাসী কর্মীরা। ক’রো’নার থাবায় কতজনের মৃ’ত্যু হয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই কারও কাছে। ক’রো’নায় মৃ’ত কর্মীর লা’শও দেশে আসেনি, দা’ফন হয়েছে বিদেশের মাটিতেই। ক’রো’নার বাইরে নানা কারণে গত দেড় বছরে ৪ হাজার ২৬২ কর্মীর মৃ’ত্যু হয়েছে বিভিন্ন দেশে। এদের বেশিরভাগই স্ট্রো’ক কিংবা হার্ট অ্যা’টাকে মা’রা গেছেন। গত বছরের জানুয়ারি থেকে এই বছরের মে পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তা জানা গেছে। তাদের বেশিরভাগের বয়স ২৮-৪১ বছরের মধ্যে।

 

তথ্য যাচাই করে আরও জানা যায়, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি লা’শ এসেছে সৌদি আরব এবং মালয়েশিয়া থেকে। সৌদি আরব থেকে এসেছে ৭৬২টি এবং মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৬৯৬টি লা’শ। লা’শ বেশি আসার এই তালিকায় আরও আছে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে লা’শ আসার পরিমাণ অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে মোট লা’শ এসেছে ২ হাজার ৮৮৪টি।

 

২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত লা’শ এসেছে ১ হাজার ৫৫৪টি। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫২১টি, মালয়েশিয়া থেকে ৩২৯টি, কুয়েত থেকে ১০০টি, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১২৮টি , কাতার থেকে ১০০টি এবং ওমান থেকে ১২৭টি। অর্থাৎ বেশির ভাগ লা’শ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ২৮ বছরে ৫ মাসে ৪১ হাজার ৩২টি লা’শ দেশে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লা’শ এসেছে ২০১৭-১৯ সালে, প্রতিবছর ৩ হাজারের ওপরে। তাছাড়া অনেক স্বজনরা লা’শ ফেরত নিতে চান না। তাই সেসব কর্মীর লা’শ দেশেও আসে না এবং থাকে হিসাবের বাইরে।

 

বিদেশে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী কর্মীদের মৃ’ত্যুর হার এত বেশি কেন তা কখনও খতিয়ে দেখা হয়নি। আবার এত বেশি কর্মী স্ট্রো’ক অথবা হার্ট অ্যা’টাকে কেন মা’রা যাচ্ছে তার সঠিক কারণ জানতেও অনু’সন্ধান করা হয়নি। তাদের মৃ’ত্যুর কারণে যা লেখা হয় তাও পুনরায় খতিয়ে দেখারও কোনও নজির নেই। প্রবাসী কর্মীদের অভি’যোগ- কর্মস্থলে দু’র্ঘটনাজনিত মৃ’ত্যুর ক্ষ’তিপূরণ এড়াতেও স্ট্রো’কে কিংবা হার্ট অ্যা’টাকে মৃ’ত্যুর কথা ডে’থ সার্টিফিকেটে লেখা হয়।

 

প্রবাসী কর্মীদের এই ধরনের অ’কাল মৃত্যুতে ক্ষ’তিগ্র’স্ত হয় তার পুরো পরিবার। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছে, ৯৫ শতাংশ অভিবাসী কর্মীর মৃত্যুর পর আর্থিক স’ঙ্কটে পড়ে যায় তার পুরো পরিবার। তার মধ্যে ৫১ শতাংশ পরিবারের ৮০-শতভাগ আয় কমে যায়। পাশাপাশি ৮১ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসেবা পেতে স’ঙ্কটে পড়ে, ৬১ শতাংশ পরিবারের সন্তানেরা স্কুলে যাওয়ার সক্ষ’মতা হা’রায় আর ৯০ শতাংশ পরিবারই দৈনিক খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর পর ৪৮ শতাংশ পরিবারই বিষ’ণ্ন’তায় ভু’গে, ৪০ শতাংশ পরিবারের ঘুমের জ’টিলতা তৈরি হয়। তাছাড়া কিছু কিছু পরিবারের এক ধরনের দায় চা’পাচা’পির মতো পরিবেশ তৈরি হয়।

 

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদেশে মৃ’তদের বেশিরভাগই হা’র্ট অ্যা’টাক, ব্রে’ইন স্ট্রো’ক, দু’র্ঘট’নাজনিত কারণে মা’রা যান। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, একটা মানুষ বিদেশ যাওয়ার আগে তাকে বেসিক ধারণা দিতে হবে। সৌদি আরবে আবহাওয়া কেমন, সেখানে কোনও ধরনের খাবার খাওয়া উপযোগী। দেশভিত্তিক এই ধরনের বিষয়ে সচেতনতা যেমন একদিকে দরকার, আরেকদিকে মৃ’ত্যুর ঘটনা তদ’ন্ত করা। বলা হয় সু’ইসাই’ড, দুর্ঘ’টনা , আসলেই তাই কিনা। আমরা যদি মৃ’ত্যুর কারণ চিহ্নিত করতে পারি তাহলে কিন্তু বিদেশগামী কর্মীদের সেভাবে সচে’তন করতে পারি। আমাদের অভি’বাসী কর্মীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি এত বেশি উপেক্ষিত থেকে যায়, বিদেশে একসঙ্গে অনেকজন গা’দাগা’দি করে থাকে, সারাক্ষণ মাথার মধ্যে চিন্তা, দেনা শো’ধ করার চিন্তা, পরিবার থেকে বিচ্ছি’ন্ন থাকে। এসব কিছু মিলিয়ে কিন্তু মৃ’ত্যুর দিকে যায়। গত ১৩-১৪ বছরের আমাদের ৪০ হাজারের মতো প্রবাসী মা’রা গেলেও এটা নিয়ে খুব একটা বড় কাজ আমাদের হয়নি। অভিবাসী কর্মীদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া খুবই জরুরি।

 

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, অভিবাসী কর্মীদের মৃ’ত্যুর ঘটনা পুনরায় ময়নাত’দন্ত করার সুযোগ বের করা দরকার। যে মৃ’ত্যু বলা হচ্ছে হার্ট অ্যা’টাকে সেটার কারণ কি অথবা যে রিপোর্টগুলো হচ্ছে সেটা কি যা হচ্ছে তাই দিচ্ছে নাকি ম্যা’নিপু’লেশন আছে সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ নিয়োগকর্তার দায় এড়ানোর সুযোগের জায়গা থেকে এমনটা করা হতেই পারে। বেশিরভাগই যারা হা’র্ট অ্যা’টাকে মা’রা যাচ্ছে তারা খুব কম বয়সের। এই হার্ট অ্যাটাকের কারণটি আসলে কি সেটা জানা দরকার।

 

তিনি আরও বলেন, একজন কর্মীর মৃ’ত্যুর পর তার পরিবারের আর্থিক স’ঙ্কট তৈরি হয়। আমরা যখন অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষার কথা বলি, তখন এই মা’রা যাওয়ার প্রেক্ষিতে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে কতটুকু কাজ করা হয়? কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমা আছে , সেক্ষেত্রেও বীমার টাকা আদায়ে দূতাবাস একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু আমরা জানি না বিভিন্ন কারণে মা’রা যাওয়া কর্মীদের বীমার টাকা দাবি করা হয় কিনা। এই বিষয়গুলা একটু ভালো করে খতিয়ে দেখার দরকার আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন




© ২০২১ | বিডি রাইট কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design BY NewsTheme